English ছবি ভিডিও
Bangla Font Problem?
শেষ আপডেট ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ
ঢাকা, রবিবার , ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৭ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

স্বপ্নের সিকিম ভ্রমণ

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

অনন্য সৌন্দর্যের আধার ভারতের পর্যটন রাজ্য সিকিম। স্বপ্নের দেশের মতো সুন্দর এ রাজ্য ঘুরে দেখা ইচ্ছা ছিল অনেক দিনের। তাই স্বপ্নরাজ্য সিকিমে আমরা ৬ জন মিলে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ এ ঢাকা থেকে সন্ধ্যা ৬ টার গাড়িতে যাত্রা শুরু করি। ফিরে আসি ২ মার্চ ২০১৯ সকাল ৯ টায়।

আমাদের পোর্ট ছিল ফুলবাড়ি, যেটা বাংলাদেশের পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা পোর্ট। এই পোর্টে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩০০-৪০০ মানুষ যাতায়াত করে। অতএব ইমিগ্রেশনের ঝামেলা একটু কমই। কিন্তু দুই দিকেই ট্রাভেল ট্যাক্স ছাড়া কিছু বাড়তি খরচ দিতে হয়। দিয়ে দিলে সমস্যা নাই, না দিলে একটু ঝামেলা করে। অতএব বাড়তি ঝামেলা না পাকানোর জন্যই দিয়ে দেওয়া ভালো।

ঢাকা থেকে বাংলাবান্ধা পোর্ট পর্যন্ত প্রতিদিন মোট তিনটা বাস যায়। হানিফের নন এসি একটা, শ্যামলী পরিবহন (SP) এর এসি একটা, আর একটা শ্যামলী পরিবহন (NR) এর RM2 এসি একটা। হানিফ ৬৫০ টাকা। শ্যামলী দুইটাই ১২-১৩০০ টাকা। সিট (২:২) যেটা ইকোনোমি ক্লাস।

এছাড়া পঞ্চগড় পর্যন্ত নাবিল, এনা, হানিফ, হুন্ডাই, স্কানিয়া বিজনেস ক্লাস (১:২ সিট) পাবেন। পঞ্চগড় পর্যন্ত গেলে সেখান থেকে লোকাল বাসে করে বাংলাবান্ধা যেতে সময় লাগবে ২ ঘন্টা।

বর্ডার ক্রস করে ইন্ডিয়ান বর্ডারে প্রবেশ করার আগে বিজিবির নিকট এন্ট্রি করাতে হয়। কারো ক্যামেরা থাকলে আগে থেকে এন্ট্রি করিয়ে নিতে হবে নতুবা ফেরার সময় ঝামেলা হতে পারে। এর পর ইন্ডিয়ান বিএসেফ টমটম (বাংলাদেশের ব্যাটারি চালিত অটো)’তে করে ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন পর্যন্ত নিয়ে যায়, সেখানে ভাড়া বাবদ জন প্রতি ১৫ টাকা করে দিতে হয়।

ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে টাকা রুপিতে করে সেখান থেকে টমটমে করে শিলিগুড়ি SNT স্ট্যান্ড পর্যন্ত গিয়েছিলাম। সেখান থেকে গ্যাংটক পর্যন্ত বুলেরো নিয়েছিলাম। শেয়ার জীপে গেলে একই বুলেরোতে ২৫০ করে নেয় কিন্তু সেক্ষেত্রে এক বুলেরোতে সামনে দুই জন আর পেছনে ৪ জন করে মোট ১০ জন বসিয়ে নেয়। যা খুবই কষ্ট সাধ্য, আমরা এক গাড়ি রিজার্ভ নিয়েছিলাম ৬ জনের জন্য।

এখানে বলে রাখা ভালো ভুলেও সেখানকার কোনো ট্রাভেল এজেন্সির সাথে কোনো রকম কন্ট্রাক্ট বা প্যাকেজে যাবেন না। কোন রকম মানে একদমই না। জীপ ভাড়া নিবেন ড্রাইভার দের সাথে দর কষা-কষি করে। কারণ শিলিগুড়ির ট্রাভেল এজেন্সিরা প্রথমে মিষ্টি কথা বলে পরে জায়গা মতো গিয়ে গলা কাটে।

গাড়ি ভাড়া করার সময় বলে নিবেন র‌্যাংপোতে পারমিশনের জন্য ৩০ মিনিট থামাতে, যদিও ১৫ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না, তবুও আগে থেকে কথা বলে নিবেন না হলে ওয়েটিং চার্জ কাটবে ইচ্ছামত। আমরা একবারে কথা বলে নিয়েছিলাম যত সময় লাগুক সেটা দেখার বিষয় না থামাতে হবে।

র‌্যাংপোতে পারমিশন সিলের সাথে তারা একটা ফর্ম নিজেরাই পূরণ করে দিবে যাতে আপনাদের নাম, পাসপোর্ট নাম্বার ও ভিসা নাম্বার লিখা থাকবে এবং সিকিমে কত দিনের জন্য থাকার অনুমতি আছে সেটাও লিখা থাকবে। এক কথায় অনুমতি পত্র দিবে একটা। এটা নিয়ে কয়েকটা ফটোকপি করিয়ে নিবেন কেননা সিকিমে এজেন্সি, সাইট সিং ও হোটেল চেকিংয়ের সময় এই অনুমতি পত্রের ফটোকপি জমা দিতে হবে। সেখান থেকে সোজা একদম গ্যাংটক স্ট্যান্ড এ নামবেন। শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক স্ট্যান্ড (শিলিগুড়ি স্ট্যান্ড এর আরেক নাম) সময় লাগবে ৪-৫ ঘন্টা। যাত্রা পথে খাওয়ার জন্য ভালো হোটেল পাবেন, আর কিছু স্পট পাবেন সেগুলো দেখে নিবেন।

গ্যাংটক স্ট্যান্ড (শিলিগুড়ি স্ট্যান্ড ও বলে) থেকে ছোট ট্যাক্সি ৪ জনের জন্য সেগুলো হোটেল পর্যন্ত এক রেট করা ১৫০-২০০ এর বেশি না। গ্যাংটক থেকে হোটেলে যাবেন আমরা যে হোটেলে ছিলাম সেটার নাম আর বিস্তারিত নিচে দিয়ে দিচ্ছি। হোটেলে চেকইন করে সেদিনই রাত ৮-৯ টার আগে MG marg এর ট্রাভেল এজেন্সির সাথে কথা বলে নিবেন ইয়ামথাং ভ্যালির জন্য। গ্যাংটক টু ইয়ামথাং ভ্যালির জন্য যাওয়া-আসা, মাঝে লাচুং এ এক রাত হোটেলে থাকা, ২ টা লাঞ্চ, ১ টা ডিনার, একটা ব্রেকফাস্টসহ কথা বলে নিবেন।

ইয়ামথাং ভ্যালি থেকে কাটাও যেতে চাইলে এক্সট্রা ড্রাইভার কে ২-৩ হাজার টাকা দিলেই ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে। ইয়ামথাং ঘুরে আবার গ্যাংটকে এনে ছেড়ে দিবে, সাঙ্গু স্ট্যান্ড/ ভাজরা ট্যাক্সি স্ট্যান্ড।

সেখান থেকে লোকাল ট্যাক্সিতে করে হোটেলে আসবেন। বলে রাখা ভালো প্রথম দিন গ্যাংটকে যে হোটেলে উঠবেন সে হোটেলে লাগেজ ব্যাগ সব রেখে যেতে হবে, শুধু এক রাতের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য এক্সট্রা চার্জ কাটে না, আর লাচুং এ এক রাত থাকলে প্রথম দিনের হোটেলে বলে দিলেই তারা রুম রিজার্ভ রেখে দিবে কিন্তু এক্সট্রা চার্জ কাটবে না।

কারন ইয়ামথাং এ যাওয়ার রাস্তা খুবই উঁচু-নিচু তাই লাগেজ নেওয়া সম্ভব না গাড়ির ছাদে, ছোট ব্যাগ নিয়ে যাবেন। এ দিক টা খুব ভালো গ্যাংটকের হোটেল গুলোর।

ইয়ামথাং থেকে ফিরে এসে হোটেলে চেকইন করবেন, আবার ট্রাভেল এজেন্সি তে গিয়ে সাঙ্গু লেকে ঘুরে আসার জন্য কথা বলে আসবেন। যদিও আমরা যেতে পারিনি আবহাওয়া খারাপ ছিল বলে। চাইলে লোকাল ট্যাক্সি ভাড়া নিয়ে সারাদিনের জন্য (সকাল ৯ টা থেকে সন্ধ্যা ৫ টা পর্যন্ত) গ্যাংটক শহর সাইট সিন করতে পারেন। এক ট্যাক্সিতে ৪ জন। ১২০০-১৫০০ রুপি পরবে।

আমরা লাচুং এ গিয়ে স্নো ফল পেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু আবহাওয়া খুবই খারাপ থাকায় ইয়ামথাং পর্যন্ত যেতে পারি নি আমরা। এর জন্য গ্যাংটকেই টুক টাক ঘুরে চলে আসছিলাম। ভাগ্যে থাকলে অসম্পূর্ণ সাইট সিন আবার পূর্ণ করবো।

খরচ সমূহ:

ঢাকা-বাংলাবান্ধা-৬৫০ টাকা। বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনে ট্রাভেল ট্যাক্স-৫০০ টাকা। পোর্ট খরচ-৫০ টাকা। এক্সট্রা খরচ-১০০ টাকা। কাস্টমস খরচ-১০০ টাকা। ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন পর্যন্ত BSF কে টমটম খরচ-১০০ টাকা। ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশনে-১০০ টাকা। ইমিগ্রেশন থেকে শিলিগুড়ি SNT স্ট্যান্ড টমটমে-৩০০ রুপি (৬জন)।

SNT থেকে গ্যাংটক স্ট্যান্ড (বুলেরো জীপ) ২৩০০ রুপি (৬জন) (আরামে ৭-৮ জন বসা যায়, কষ্ট করে সর্বোচ্চ ১০ জন)। গ্যাংটক থেকে হোটেল ১৫০ রুপি লোকাল ট্যাক্সি (৪ জন)।

একদিনের হোটেল ভাড়া ১২০০ রুপি। ৬ জন ছিলাম একসাথে এক রুমে। কারণ ২টা বড় ডাবল বেড ছিল এক একটায় অনায়াসে ৩ জন ঘুমানো যায়। লাচুং থেকে ইয়ামথাংভ্যালি ১৩০০০ রুপি (6 জনের জন্য)।

হোটেল থেকে সাংগু স্ট্যান্ড লোকাল ট্যাক্সি-৩০০ রুপি (৪জন)। এখান থেকেই ইয়ামথাং যাওয়ার গাড়ি ছাড়ে। গ্যাংটক স্ট্যান্ড থেকে শিলিগুড়ি ২৩০০-২৫০০ ভাড়া। শিলিগুড়ি থেকে ফুলবাড়ি বর্ডার টমটমে করে ৩০০ ইমিগ্রেশনে আবার সেই আগের মতো একই খরচ করে দেশে ঢুকে বাসে করে চলে আসবেন।

অন্যান্য তথ্য:

১/ ইন্ডিয়ান সাইডে ফুলবাড়ি বর্ডার ইন্ডিয়ান সময় ৫ টার মধ্যে পৌঁছাতে পারলে ইমিগ্রেশন শেষ করে দেশে ঢুকতে পারবেন। যদি কোনো কারণ বশত না হয়, তাহলে শিলিগুড়ি SNT স্ট্যান্ড এর পেছনেই ভালো ভালো হোটেল আছে।

২/ খুব সাবধান থাকতে হবে শিলিগুড়ি তে থাকলে, কারন সেখানকার মানুষ ঢাকার গুলিস্তানের বাটপারের ও বাপ।

৩/ শিলিগুড়ি হোটেলে উঠার আগে রুমে কি কি সুযোগ সুবিধা আছে তার সব ইন ডিটেইলে জিজ্ঞেস করে নিবেন।

৪/ গ্যাংটক শহরের আওতায় সকল যায়গায় প্রকাশ্যে উন্মুক্ত স্থানে ও পাবলিক স্থানে ধূমপান নিষিদ্ধ ধরা পরলে ৫০০ রুপি জরিমানা, আর ময়লা ফেললে ৫০০০ রুপি জরিমানা। ৫ বছরের জন্য ভারত ভ্রমণে নিষিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।

৫/ গ্যাংটকে যে এজেন্সিতেই যান সব কিছু ডিটেইলে জিজ্ঞেস করে নিবেন। আমরা প্রথম বার বলে একটু ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল। একটা ট্রাভেল এজেন্সির লোকের নাম (চন্দন) তার ওখানে ভুলেও যাবেন না।

৬/ গ্যাংটক থেকে সাঙ্গু লেক গেলে ৫০০০ রুপি খরচ পরবে ৬ জনের জন্য টয়োটা ইনোভা গাড়িতে।

৭/ খাবারের খরচ দেই নি কারন সেটা নিজের উপরে ডিপেন্ড করে আপনি কি খাবেন।

৮/ গ্যাংটক শহরে কয়েকটা মুসলিম হোটেল আছে আমাদের কাছে দুইটা ভালো লাগছে। ১, খান (এমজি মার্ট এর নিচেই অবস্থিত)।২, আসলাম বিরানি (এটা নতুন তবে এটা জান্নাত হোটেলের ঠিক উল্টো দিকের গলির একটু ভেতরে) গুগল করলেই পেয়ে যাবেন।

৯/ সিম আগের থাকলে ভালো, নতুন নিলে শিলিগুড়ি বা অন্য কোথাও থেকে নিতে হবে। অন্যথায় সিকিম রাজ্যের আওতায় সিম বাংলাদেশিদের নিতে দেয় না, দিলেও একটু কষ্ট হয়। রিচার্জ মোটামোটি এয়ারটেল, ভোডাফোনের সকল যায়গায় ই পাবেন।

১০/ পারমিশনের জন্য পাসপোর্টের মিনিমাম ১০ টা কপি, ভিসার কপি ও ১০ টা পাসপোর্ট সাইজের সদ্য তোলা ছবি নিয়ে যাবেন। কম-বেশি সাইট ভিজিটের উপর ডিপেন্ড করে।

১১/ র‍্যাংপোতে পারমিশন নিতে কোনো টাকা লাগে না, পাসপোর্ট, পাসপোর্টের কপি, ভিসার কপি ও এক কপি ছবি নিয়ে গেলে সেগুলো রেখে পাসপোর্টে একটা সিল দিয়ে দেয় ও একটা কাগজে গ্রুপে যে কয়জন থাকে সে কয়জনের নাম লিখে একটা পারমিট পেপার দিয়ে দেয়।

১২/ পারমিট পেপারের ১০ টা ফটোকপি র‍্যাংপোতে এর অফিস এর ঠিক উল্টা পাশ থেকে করে নিবেন। মেইন কপি রেখে দিবেন। ফটোকপি দিয়ে সব যায়গায় কাজ চালাবেন।

১৩/ ফটোকপি দিয়েই গ্যাংটকের সকল হোটেল ও এজেন্সির কাছে রুম ও গাড়ি বুকিং নিতে হবে।

১৪/ ফেরার দিন আবার র‍্যাংপোতে এসে অরিজিনাল পেপার টা জমা দিয়ে দিবেন ও প্রত্যেকের পাসপোর্টে ডিপার্চার ডেট লিখিয়ে নিয়ে যাবেন।

১৫/ নর্থ সিকিম তথা ইয়ামথাং এর ওদিকে যাওয়ার সময় Toon station 4000ft উপরে পুলিশের পারমিশন পেপার দেখাতে হয় সেটা ড্রাইভার বা এজেন্সি নিজে করিয়ে দিবে।

১৬/ নর্থ সিকিমে শুধু মাত্র মিনারেল পানির বোতল এলাও করে না, অন্য যে কোনো ড্রিংস এর বোতল এলাও করে। পরিবেশের ক্ষতি হয় কোনো ময়লা আবর্জনা অন্যথায় না ফেলে যথাস্থানে ফেলবো, শুধু সিকিমেই নয় পৃথিবীর সকল যায়গায়।


জনপ্রিয় বিষয় সমূহ: