Tuesday, 19 Jun 2018
সর্বশেষ খবর
 

পাঁচ মামলায়ই জামিন পেলেন খালেদা



পাঁচ মামলায়ই জামিন পেলেন খালেদা

০৫ এপ্রিল ২০১৬: বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার পাঁচটি মামলায় ঢাকার নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন। মঙ্গলবার পাঁচজন বিচারক মামলাগুলোর শুনানির পর সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর জামিন মঞ্জুর করেন।

মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে খালেদা জিয়া প্রথমে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের দ্বিতীয় তলার এজলাসে পৌঁছান। পৌনে ১১টায় এ মামলায় বিচারক ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. কামরুল হোসেন মোল্লা এজলাসে ওঠার পর শুনানি শুরু হয়। বিচারক এজলাসে ওঠার পর আইনজীবীরা খালেদা জিয়ার বসার অনুমতি চাইলে বিচারক তা মঞ্জুর করেন। এরপর কাঠগড়ার পাশে পূর্বে থেকে তার জন্য রাখা একটি চেয়ারে তিনি বসেন।

যাত্রাবাড়ী থানার পেট্টলবোমায় মানুষ পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের এই মামলায় গত ৩০ মার্চ একই বিচারক খালেদা জিয়াসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। মামলাটিতে বেগম খালেদা জিয়া ছাড়াও সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের পক্ষে আত্মসমর্পণপূর্বক জামিনের আবেদন করা হয়।

আসামিপক্ষে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদীন এবং সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মাদ আলী জামিন আবেদনের ওপর শুনানি করেন। শুনানিতে তারা বলেন, বিশেষ ক্ষমতা আইনের এই মামলায় কাউকে আসামি করতে হলে তাকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকতে হয়। যাত্রাবাড়ীর ওই ঘটনার দিন বেগম খালেদা জিয়া তার গুলশান কার্যালয়ে অন্তরীণ ছিলেন। তাই এই মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জশিট হওয়াটা হাস্যকর। এছাড়া তিনি একজন নারী, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তাই পালানোর কোনো সম্ভবনা নেই।

আসামিপক্ষের শুনানির পর রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, এটা সত্য যে খালেদা জিয়া সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না, তবে তার ডাকা কর্মসূচির কারণে তারই নির্দেশে সেদিন এই ঘটনা ঘটে। তাই আমি তার জামিনের বিরোধিতা করছি। শুনানি শেষে বিচারক সোয়া ১১টার দিকে খালেদা জিয়া এবং মাহবুব হোসেনের জামিন মঞ্জুর করেন।

বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় জামিন মঞ্জুর হওয়ার পর খালেদা জিয়া একই ভবনের ৬ তলায় অবস্থিত ঢাকার ৩ নম্বর বিশেষ জজ আদালতে গ্যাটকো দুর্নীতি মামলার শুনানির জন্য সাড়ে ১১টার পৌঁছান। ওই আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন জামিন আবেদনের ওপর শুনানিতে বলেন, উচ্চ আদালত থেকে তিনি এই মামলায় জামিনে ছিলেন। উচ্চ আদালত তাকে মামলাটিতে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলেছেন। আদালতে নির্দেশনা রয়েছে জামিন বিবেচনা করার জন্য। তাই আমরা তাঁর জামিন প্রার্থনা করছি।

এরপর দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল মামলায় খালেদা জিয়ার দুর্নীতি সম্পর্কে বক্তব্য উপস্থাপন করলে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা উত্তেজিত হলে তাদের মধ্যে মৃদু বাকবিতণ্ডা হয়। উভয় পক্ষে শুনানির পর বিচারক আবু আহমেদ জমাদার বলেন, আমি আসামি খালেদা জিয়ার এক লাখ টাকা মুচলেকায় জামিন মঞ্জুর করছি। তবে এ মামলায় তার সন্তান কোকো আসামি রয়েছেন। তিনি মারা গেলেও তার মৃত্যুর কোনো সনদ আদালতে এখনো দাখিল হয়নি। তাই আগামী ১৪ এপ্রিল ধার্য তারিখে মৃত্যুর সনদ আপনারা দাখিল করে দেবেন।

দুই মামলায় জামিন হওয়ার পর আরও চারটি মামলায় জামিন আবেদনের শুনানির জন্য খালেদা জিয়া বেলা ১২টার ১০ মিনিটে ঢাকা সিএমএম আদালতের দ্বিতীয় তলার ২৮ নম্বর এজলাসে পৌঁছান। ওই আদালতে প্রথমে ঢাকা মহানগর হাকিম জাকির হোসেন টিপু রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় জামিন আবেদনের ওপর শুনানি গ্রহণ করেন।

খালেদা জিয়ার পক্ষে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, বেগম খালেদা জিয়া সেদিন যে বক্তব্য দিয়েছেন তার মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহিতার কোনো উপাদান ছিল না। একজন ব্যক্তিকে সরকার অনুমতি দিয়ে শুধু রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্য এই মামলা দায়ের করিয়েছে। সমন জারি হওয়ায় সম্মান দেখিয়ে তিনি আদালতে হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করছেন।

এই মামলায় জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, মীমাংসিত বিষয় শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সেদিন খালেদা জিয়া বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। আওয়ামী লীগে কোনো মুক্তিযোদ্ধা নেই তাও বলেছেন। আমরা তার জামিনের বিরোধিতা করছি। শুনানি শেষে বিচারক পাঁচ হাজার টাকা মুচলেকায় এই মামলায় জামিন মঞ্জুর করেন।

এরপর গুলশান থানার একটি নাশকতার মামলায় জামিন আবেদনের শুনানি গ্রহণ করেন ঢাকা মহানগর হাকিম কায়সারুল ইসলাম। এই মামলায় আসামি এবং রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি শেষে বিচারক ১০ হাজার টাকা মুচলেকায় জামিন মঞ্জুর করেন।

এরপর যাত্রাবাড়ীতে পেট্টলবোমায় মানুষ হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের মামলায় জামিন আবেদনের শুনানি গ্রহণ করেন ঢাকা মহানগর হাকিম মারুফ হোসেন। মামলাটিতে খালেদা জিয়া ছাড়াও অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনের পক্ষে জামিনের আবেদন করা হয়।

এই মামলাটিতে আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন এবং এজে মোহাম্মাদ আলী ও সানাউল্লাহ মিয়ার বক্তব্যের পর বিচারক বলেন, মামলাটিতে চারজন আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রয়েছেন। এ সম্পর্কে বলুন। এ সময় আইনজীবীরা বলেন, মামলাটিতে চার্জশিট হলেও চার্জশিট এখনো গ্রহণ হয়নি। তাই আমরা স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি পড়তে পারিনি। আর তিনি (খালেদা জিয়া ) হুকুম দিয়েছিলেন কি না তা ট্রায়ালের সময় দেখা যাবে। শুনানি শেষে আদালত জামিন মঞ্জুর করেন।

এরপর ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান নুর গুলশান থানার জামিন হওয়া মামলায় তার ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতির আবেদন মঞ্জুর করেন। বেলা ১টার দিকে সব মামলায় জামিন হওয়ার পর খালেদা জিয়া আদালত অঙ্গন ছেড়ে যান।

এদিকে জামিন আবেদনের শুনানির সময় খালেদা জিয়ার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, শাহজাহান ওমর, আব্দুল আওয়াল মিন্টু, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, এজেড এম জাহিদ হোরসন, সেলিমা রহমান, সঙ্গীতশিল্পী বেবি নাজনীন প্রমুখ।

খালেদা জিয়া আদালতে আসা উপলক্ষে আদালত চত্বর ও এর বাইরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দ্বারা ব্যাপক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়।

যাত্রাবাড়ী থানার হত্যা মামলা: ২০১৫ সালের ২৩ জানুয়ারি রাতে যাত্রাবাড়ীর কাঠেরপুল এলাকায় গ্লোরি পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করা হয়। এ ঘটনায় যাত্রী হত্যার অভিযোগে পরদিন খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কেএম নুরুজ্জামান।

২০১৫ সালের ৬ মে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) বশির উদ্দিন খালেদা জিয়াসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

যাত্রাবাড়ী থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা: যাত্রাবাড়ীর ওই একই ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের একটি মামলা হয়। ওই মামলায় ২০১৫ সালের ১৯ মে খালেদা জিয়াসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এই মামলায় গত ৩০ মার্চ খালেদা জিয়াসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা: বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান গ্যাটকোকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডি ও চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজ পাইয়ে দিয়ে রাষ্ট্রের ১৪ কোটি ৫৬ লাখ ৩৭ হাজার ৬১৬ টাকার ক্ষতি করেন।

এ ঘটনায় ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী তেজগাঁও থানায় এ মামলা করেন।

গুলশানের নাশকতার মামলা: ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয় ঘেরাওয়ের পথে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের মিছিলে বোমা হামলার ঘটনায় বেগম খালেদা জিয়াসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ঢাকা জেলা যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ঈসমাইল হোসেন বাচ্চু।

রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে দায়ের করা মামলা: ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, আজকে বলা হয় এত লক্ষ শহীদ হয়েছে, এটা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে।

২০১৬ সালের ২৫ জানুয়ারি সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ড. মোমতাজ উদ্দিন আহমদ মেহেদী এই মামলা করেন। মামলায় বেগম জিয়া আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেয়া হয়।


সর্বশেষ খবর