English ছবি ভিডিও
Bangla Font Problem?
শেষ আপডেট ৬:৪৭ অপরাহ্ণ
ঢাকা, বুধবার , ২০শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

করোনা : ওপার-এপার

Facebooktwitterredditpinterestlinkedinmail
বার্তা16 অনলাইন এপ্রিল ৮, ২০২০

আমিরুল মোমেনীন

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ’৭২ সালে প্রথম সুযোগেই আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট করে নেই। তখন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাড়াবাড়ি ছিল কেবল দু’দেশের কাস্টমসদের। বাংলাদেশ কাস্টমসের কথা ছিল ‘কোনো বাংলা টাকা নিয়ে যাওয়া যাবে না’। তাহলে ওপারে গিয়ে যাতায়ত খরচ কোথায় পাব তার কোন জবাব ছিল না।

একবার এক বন্ধুর পরামর্শে প্যান্টের কোমরের পকেটে একশ’ টাকার দু’খানা নোট এনে ধরা পড়ে যাই। মনে হয় বেনাপোলের কাস্টমসরা ইতিমধ্যে যাত্রীদের এই কৌশল জেনে গেছে। সংগে কোন টাকা নেই বলামাত্র কাস্টমস ইন্সপেক্টর সটান দাঁড়িয়ে আমার কোমরে হাত দেয়। কোন ভনিতা না করে বলে, ‘একখান রেখে যান’।

ভারতের কাস্টমস একইভাবে জানতে চাইল ‘কত টাকা এনেছেন’? একশ’ টাকা বলতেই বলন, ‘এ টাকায়তো এদেশে ঢোকা যাবে না। আপনি বেড়াতে এসেছেন অথচ টাকা নেই’। বললাম বন্ধু-বান্ধব আছে তারাই ব্যবস্থা করবে। ‘বুঝেছি আপনি টাকা হুন্ডি করেছেন, আমাদের দেশে হুন্ডি এলাউ না’। কিছুক্ষণ বাজিয়ে ছেড়ে দেয়। পরে কয়েকবার বিমানে কলকাতা যাই। ২০০৪ সালে স্বপরিবারে চেন্নাই যাই। চোখের অপারেশন শেষে প্রায় এক মাস পর ফিরে আসি। কেনাকাটা বলতে বাচ্চাদের কাপড়-চোপড়। তাছাড়া গিফ্ট দেয়ার জন্য ৬০ রুপি দামের কয়েকটি শাড়ি। পশ্চিম বাংলার হরিদাসপুর সীমান্তে এলে কাস্টমস ইনসপেক্টর বলেন, ‘অনেক কেনাকাটা করেছেন, এখন আমাদের কি দেবেন দেন’। আমার চোখে কালো চশমা ছিল। বললাম কেনাকাটা নয়, চোখের অপারেশনের জন্য এসেছিলাম। এরপরও তিনি একশ’ টাকা দাবি করেন। ৫০ টাকা দিয়ে মুক্তি পাই।

বাংলাদেশ সীমান্তে এলে কাস্টমসের দালালের (আসলে পিয়ন) খপ্পরে পড়ি। তার কথা সাড়ে তিনশ’ টাকা দিলে কাস্টমস কিছুই বলবে না। সোজা কাস্টমসের টেবিলে হাজির হই, পিছনে আসে ওই দালাল। সেখানে বসা সুদর্শন ইনসপেক্টরকে দেখে মেজাজী মনে হলো। তিনি আমার পাসপোর্ট নেড়েচেড়ে দেখতে থাকেন। হঠাৎ জিজ্ঞাস করি আপনার নাম কি? পকেটের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘নামতো একটা দেখতেই পাচ্ছেন’। কালো চশমা খুলে তার পকেটের কাছে চোখ নিয়ে অবাক হই। এই শ্রেণীর মানুষ বিনয়ী হয়, এ ব্যতিক্রম। আমি যখন কিছুটা  ধৈর্য হারাচ্ছি ঠিক তখনই একজন সুপারিন্টেন্ড দৌড়ে এসে আমার পাসপোর্ট হাতে নেন। এরপর তিনি কি যেন দেখেই ‘ছাড়ো ছাড়ো’ বলেই অদৃশ্য হয়ে যান। এরপর আরো কয়েকবার এই রুট দিয়ে গেছি কোনবারই কাস্টমস কোথা দিয়ে পার হয়ে এলাম-গেলাম টের পায়নি। তবে ইদানিং আনসারদের উৎপাত শুরু হয়েছে। এরা মানুষ বুঝে চাঁদাবাজির চেষ্টা করে। গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে হরিদাসপুরে ভারতীয় কাস্টমস পার হওয়ার সময় বয়স্ক এক কর্মচারি চেয়ারে বসে থেকেই একটা ঝুড়ি (ময়লা ফেলার) উচু করে ধরেন, ‘এখানে একশ টাকা ফেলুন’। সবাই বিনা বাক্য ব্যয়ে একশ’ টাকার একখানি নোট ফেলে চলে যান।

সর্বশেষ  ২০২০ সালের ১২ মার্চ কলকাতা যাই। যথারীতি পূর্ব পরিচিত এক হোটেলে উঠি। নিউমার্কেটের কাছে ১০ কিড স্ট্রিটে ‘পুষ্পক ইন্টারনাশানাল’। গত জুনে কলকাতা গিয়ে এই হোটেলের সন্ধান পাই। এখানে ডরমিটরি রয়েছে। বিশাল রুম, উপরে নীচে ৪৮ জনের থাকার ব্যবস্থা। প্রতি জনের ভাড়া ৫০০ রুপি। মুসলিম প্রধান এলাকায় আমার জানা মতে এটাই একমাত্র হিন্দু মালিকের হোটেল। হোটেলটির বিশেষত: হচ্ছে সবসময় ক্লিন করা হয় এবং রাস্তার উল্টোদিকেই রয়েছে মসজিদ। এবার হোটেলে গিয়ে পছন্দ মত একটি সিট পেয়ে যাই। কিন্তু তিন-চার দিনের মধ্যে রুম প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। আমি আসার পরদিনই বাংলাদেশীদের ভারতে প্রবেশ বন্ধ করা হয়। ফলে বাংলাদেশ থেকে নতুন করে কেউ আসতে পারেছে ন। নিউমার্কেটের পিছনে শত শত হোটেল বাংলাদেশী পর্যটকদের টার্গেট করে রাতারাতি তৈরি করা হয়েছে। হোটেলের কর্মচারিদের বলি, হোটেল যে ফাঁকা হয়ে গেল, এখনতো আমার একা থাকতে ভয় হচ্ছে। ‘কি বলেন স্যার, আমাদের তিন কর্মচারি আপনাকে পাহারা দেবে। আপনি যাবেন না। দরকার হলে বলবেন আপনার বাড়ি থেকে টাকা আনার ব্যবস্থা করে দেব’। আসলে ওরা চাচ্ছিল হোটেলটি চালু রাখতে। একজন বোর্ডার থাকলেও মালিক হোটেল বন্ধ করতে পারবে না।

চক্ষু হাসপাতাল ‘শংকর নেত্রালয়’র কলকাতা শাখায় এপয়েন্টমেন্ট চেয়েছিলাম। ওরা ১৪ মার্চ শনিবার এপয়েন্টমেন্ট দেয়। মেসেজ সময়মত দেখতে না পারায় এপয়েন্টমেন্ট মিস করি। পরদিন কলকাতার নিউটানের রাজারহাটে স্বশরীরে হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে একদিন পর এপয়েন্টমন্টে নিয়ে আসি। মঙ্গলবার চোখ দেখানোর পর কোন ত্রুটি ধরা না পড়ায় পরদিন দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেই। খোঁজ নিয়ে জানি কলকাতা থেকে বাস যায় না। বর্ডারে যেতে হবে শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে। প্রথম ট্রেন ছাড়বে রাত সোয়া তিনটায়।
ঢাকা থেকে কলকাতার পরিচিতজনদের জন্য ১শ’ টাকা দামের গেঞ্জি, চানাচুর, টোস্ট, চকলেট ও বিস্কুট নিয়ে যাই। কলকাতার বন্ধুরা আমার উপহার পেয়ে যুগপৎ খুশি ও বিষ্মিত হয়েছেন। তাদের শিকড়ও বাংলাদেশে, তাই আজও দেশটির প্রতি সমান টান অনুভব করেন। কলকাতা থেকেও একই জিনিষ কিনি  (জামা-কাপড় বাদে)।

রাত সোয়া তিনটায় ট্রেন। জানি ঘুম আসবে না। তাই সময় কাটাবার জন্য হোটেলে বসে পলিথিনের ব্যাগে চকলেট বিস্কুট ভরে নাম লিখছিলাম। ৪৮ জনের রুমে এখন আমি একা। উত্তেজনায় বারবার চোখ মুখ ধুতে ওয়াশ রুমে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ লক্ষ করলাম আমার বিপরীত দিকের বেডে শুয়ে আছে এক সুদর্শন যুবক। মুখে দাড়ি, পরনে শার্ট-প্যান্ট। ভাবলাম একজন বাংলাদেশি এখনও হোটেলে রয়ে গেছে। এগিয়ে যেতেই উঠে বসলেন। জানতে চাইলাম আপনি কবে যাবেন? -‘২৬ তারিখ’। দেখে মুসলামান মনে হওয়ায় মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় ইশারায় আজানের কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম। এরপর হোটেলে ফিরে কারণে-অকারণে বারবার বাইরে আসা যাওয়া করি। খুবই অস্থির  লাগছিল।

এরমধ্যে একবার কর্মচারিদের আবদার মেটাতে কস্তুরি হোটেলে গিয়ে তাদের জন্য মুরগির মাংস, ডাল ও ভাত নিয়ে আসি। খাবারের ব্যাগটি রিসেপশনের এক কর্মচারির হাতে তুলে দিতেই সে এত আস্তে ‘থ্যাাঙ্ক ইউ’ বলল যা শুনে আমি হতভম্বের মত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। যাদের কস্তুরি হোটেলের খাবারের প্রতি এত মোহ তারা হঠাৎ এত নিস্প্রভ কেন। কারণটা তখনও বুঝতে পারি নি। সারাদিনই হোটেলের স্টাফদের বিষন্ন দেখেছি। আমার পক্ষে কিছুই আন্দাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে আমি আজ রাতে চলে যাব শোনার পর তারা যেন কিছুটা স্বস্তি পেল। এতদিন বলেছে, ‘আপনি যাবেন না’। এখন বলছে Ñ‘হাঁ স্যার, তাড়তাড়ি ফিরে যান। পরে হয়তো যেতে পারবেন না’। তাদের বাক্য পরিবর্তনকে স্বভাবিকই মনে হলো। রাত বারোটায় এক কর্মচারি এসে জানতে চাইলো ‘স্যার, আপনাকে কখন ডেকে দিতে হবে’? বললাম রাতে ঘুম হবে না। তাই ডাকতেও হবেনা।

আমার বেডের অপর পাশে আশ্রয় নেয়া যুবক রাত একটার পর থেকে আমাকে বারবার তাগাদা দিতে থাকে ‘আপনার এখনই যাওয়া উচিৎ। শিয়ালদহ স্টেশনে কম করে দুই-আড়াই ঘন্টা লাগবে করোনা ভাইরাস টেস্ট করাতে’। বিশ্বাস হলো না। কারণ ওই দিন সন্ধ্যায় শিয়ালদহ স্টেশনে গিয়ে কিছুই দেখতে পাইনি। এরপরও তার চাপাচাপিতে রাত দু’টায় হোটেল থেকে বের হই। ট্যাক্সিতে ওঠার সময় ওই যুবক ভিতর থেকে ছুটে এসে বলে, ‘করেছেন কি, আপনি যে বিছানায় বসে ভাত খেয়েছেন সেখানেতো তরকারির ঝোল লেগে আছে’। এবার বুঝতে পারলাম যুবকটি হোটেল মালিক বা মালিকের ছেলে। আমার দেখা মতে চাদরে দুই এক ফোটা ঝোল পড়েছিল। এমনিতেই সাত দিনে একবারও বিছানার চাদর পাল্টাতে বলিনি। তাই গুরুত্ব দেয়নি। জানতে চাইলাম, এ জন্য কত দিতে হবে? Ñ‘৫’শ টাকা’। আমার দেখা মতে চাদরটির দাম সর্বোচ্চ দেড়শ’ টাকা। পকেট হাতড়ে ৫শ’ টাকা দিয়ে বললাম, দাম যখন দিচ্ছি চাদরটি আমাকে দিয়ে দিন। Ñ‘না, না, এটা দাম না, ওয়াশ করার খরচা’।

শুনে তাজ্জব বনে গোলাম একটা চাদর ওয়াশের জন্য পাঁচশ টাকা। এ ধরণের জরিমানা দিয়ে মাথাটা বিগড়ে গেল। ফলে শিয়ালদহ রেলস্টেশনে গিয়ে যথারীতি এক বাটপারের পাল্লায় পড়ে ঘাড়ের ব্যাগটি খোয়া য়ায়। রাত আড়াইায় স্টেশনে পৌছালেও প্লাটফর্ম খুজে না পাওয়ায় সোয়া তিনটার ট্রেন মিস করি। রাত সোয়া ৪টার ট্রেনে রওয়ানা হয়ে সকাল ৭টার দিকে বনগাঁও স্টেশনে পৌঁছাই। সেখান থেকে অটোতে বর্ডার। বর্ডারে যাত্রি কমে যাওয়ায় বিদেশি মুদ্রার এজেন্টরা এখন মহা বাটপারের ভূমিকায় নেমেছে। এক দল বাটপারের হাতে রীতিমত আটক হবার পর উপস্থিত বুদ্ধিতে বেঁচে যাই। কোনরকমে একজন কুলি নিয়ে ভারতীয় ইমগ্রেশন পার হই।

কাস্টমসের দিকে যেতে কুলি বলল, ‘স্যার এখানে ১শ’ টাকা চাইবে’। বললাম, আমার কাছে চাইবে না। কিন্তু কাস্টমসের মুখোমুখি হতেই ইনসপেক্টর ইশারায় দুই আঙ্গুল দেখালেন। আমাকে কেউ বয়স্ক বললে ভালো লাগে না। তবে নিজ প্রয়োজনে এই পরিচয়টা কাজে লাগাই। কাস্টমস ইনসপেক্টরের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললামÑ আমি বয়স্ক মানুষ একশ’শ টাকা দিলে হয় না। ‘ঠিক আছে’ বলে তিনি অন্য যাত্রীর প্রতি মুখ ফেরান। আমি একশ’ টাকা দিয়ে বাংলাদেশের দিকে পা বাড়ালাম। এপারে কোন সমস্যা হয়নি। বরাবরের মত কাস্টমস কোথায় বসে তা জানতেই পারলাম না। ঠিক নটায় বাস স্টান্ডে পৌঁছে যাই এবং বাসে ওঠার দশ মিনিটের মধ্যে ছেড়ে দেয়। বিকেল চারটায় ঢাকায় পৌঁছি। বেবি ট্যাক্সিতে বাসায় পৌঁছে পরিস্থিতি কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হলো।

অন্য সময় নীচে আমার জন্য কেউ কেউ অপেক্ষা করেছে, আজ ব্যতিক্রম। কেবল সিকিউরিটির একজন আমার মালপত্র লিফটের গোড়ায় পৌঁছে দেয়। কলিং বেল চাপতেই মেয়ে দরজা খুলে দেয়। একাবারেই নিস্প্রভ। যখনই ঢাকার বাইরে গেছি কি নিয়ে এসেছি জানতে চাইত। এবার এতদিন পর কলকাতা থেকে কি নিয়ে এসেছি সে ব্যাপারে কারও কোন কৌতুহল নেই। এরপরই হাজির হয় ওদের মা। সে আমার ঘর দেখিয়ে ১৪ দিন সেখান থেকে বের হতে নিষেধ করে। সবকিছুকে আমার বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছিল। দেশে ঢোকার সময় আমাদের এ ব্যাপারে কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি। জানতাম মধ্যপ্রাচ্য এবং চীন-ইউরোপ-আমেরিকা থেকে যারা আসছেন তাদের কোয়ারেনটাইনে থাকতে বলা হচ্ছে। বাসায় এসে শুনলাম বারবার টিভিতে নাকি বলা হয়েছে, ভারত ঘুরে যারা আসছেন তাদেরও কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। এখন মনে হচ্ছে হোটেল মালিকও করোনা আতংকে ছিল। তাছাড়া আমি থাকাতে তাদের লোকসানের কড়ি গুনতে হচ্ছিল।

একজনের জন্য বিশাল রুমে এসি চালিয়ে রাখাসহ সব ধরণের স্টাফকে ব্যস্ত রাখতে হচ্ছিল। তাই আমাকে বিদায় করার জন্য কর্মচারীদের সে বকাঝকা করে থাকতে পারে। কিন্তু কর্মচারিরা চক্ষু-লজ্জার খাতিরে আমাকে কিছুই বলতে পারেনি।

লেখকঃ সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাসস


জনপ্রিয় বিষয় সমূহ: